এক্সক্লুসিভ নিউজজাতীয়

পাপিয়াকাণ্ডে ফেঁসে যাচ্ছেন যুব মহিলা লীগের একাধিক নেতা

কোটি টাকার প্লট,বিলাসবহুল গাড়ি এবং ফ্ল্যাট। নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। বিদেশি পিস্তল। নগদ টাকা। কী নেই তার? সবই আছে। আছে বিশেষ ধরনের ব্যবসা। রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বিশেষ নেটওয়ার্ক।তিনি শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক(বহিষ্কৃত) ছিলেন। আর এই পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। টাকার জোরেই নরসিংদী যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন। প্রতি দিনই ওই হোটেলে পাপিয়ার নামে প্রেসিডেনশিয়াল স্যুট ও বার বুকিং থাকত। টানা তিন মাস প্রতিদিন বারের বিল দিতেন আড়াই লাখ টাকা করে। নরসিংদী জেলা মহিলা যুবলীগের নেত্রী হয়ে এত অর্থ পেলেন কোথায় পাপিয়া? ১৫ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনে মঙ্গলবার এমন অনেক প্রশ্নের জবাবে মুখ খুলেছেন তিনি।

রিমান্ডে যুবলীগ থেকে সদ্য বহিস্কৃত এই নেত্রী জানান, কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আকতারসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার নাম ভাঙিয়ে চলতেন তিনি। গ্রেপ্তারের ঘটনায় তার ক্যারিয়ারের ক্ষতি হলেও এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই তার। হোটেলকেন্দ্রিক বিলাসী জীবন-যাপনের কথাও স্বীকার করেছেন পাপিয়া। বলেছেন, ছবি-ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণা করে অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে এসব তথ্য জানান।

গত রোববার পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে মতি সুমন চৌধুরীকে তিন মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৫ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। এছাড়া তাদের সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়িব্যাকে এক মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। বিমানবন্দর থানা পুলিশ পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

পুলিশ-র‌্যাবের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এক সময় পাপিয়া চক্রের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। গ্রেপ্তারের পর অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ বিমানবন্দর থানায় গিয়ে গতকাল পাপিয়ার মাধ্যমে নির্যাতিত হওয়ার কাহিনি বলছেন।

পাপিয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার গোপালগঞ্জের টোকন তালুকদার। তিনি বলেন, মাস পাঁচেক আগে তার বন্ধু দিদারের সঙ্গে দেখা করতে নরসিংদী যান। এই বন্ধুর সঙ্গে টোকনের একটি লেনদেন ছিল। পরে দিদার তাকে পাপিয়ার নরসিংদীর বাসায় ডেকে নেয়। সেখানে যাওয়ার পর কয়েকটি মেয়েকে দেখেন তিনি। খানিকক্ষণ পর ওই মেয়েদের সঙ্গে টোকন তালুকদারকে অসামাজিক ছবি ও ভিডিও করার জন্য চাপ দেন পাপিয়া। এক পর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। গোপালগঞ্জের পরিচয় দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় মহিলা যুবলীগের সভাপতি নাজমা আকতারকে ফোন করেন পাপিয়া। লাউড স্পিকারে কথোপকথন শোনানো হয়। নাজমার সঙ্গে কথা শেষ করে পাপিয়া বলেন, টাকা না দিলে মানব পাচারকারী হিসেবে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হবে। তখন নগদ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আর ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে পাপিয়াকে পরিশোধ করেন টোকন তালুকদার। একদিন পাপিয়ার বাসায় আটক থাকার পরে টাকা দিয়ে ছাড়া পান টোকন।

টোকন তালুকদার বলেন, নির্যাতিত হয়ে টাকা দেওয়ার সব প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। মঙ্গলবার বিমানবন্দর থানায় গেলে পুলিশ তার সামনে পাপিয়াকে নিয়ে আসে। তখন টোকনের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের কথা স্বীকার করেন পাপিয়া। ভুল হয়েছিল বলে ক্ষমা চান পাপিয়া। আর পাশ থেকে পাপিয়ার স্বামী সুমন বলতে থাকেন, টোকনের কাছ থেকে নেওয়া টাকা পরিশোধ করে দেওয়া হবে। এ নিয়ে তিনি যাতে আর কিছু না করেন, সেই অনুরোধ করেন সুমন।

নরসিংদী জেলার একাধিক নেতা জানান, পাপিয়া জেলা যুব মহিলা লীগের নেত্রী হলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের দাপট নিয়ে চলাফেরা করতেন। তার চালচলন দেখে জেলার অনেক সিনিয়র নেতাও বিভিন্ন সময় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এমনকি স্থানীয় নেতাদের তোয়াক্কা না করে কেন্দ্রীয় নেতারা হঠাৎ জেলা মহিলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে তার নাম ঘোষণা করেন। ঢাকায় বসেই ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু বলেন, পাপিয়া লবিং করে ঢাকা থেকে জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। ২০১৪ সালে সম্মেলন মঞ্চে স্থানীয় নেতাদের তোপের মুখে পাপিয়াকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করতে পারেনি কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগ। পরে ঢাকায় গিয়ে পাপিয়াকে যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নরসিংদী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন ভূঁইয়া বলেন, স্থানীয় নেতাদের মতামত উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় নেতারা পাপিয়াকে নরসিংদীর রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, পাপিয়া জেলার অনেক নেতাকর্মীকে গুলশানের পাঁচতারকা হোটেলে দেখা করতে বলতেন। যাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল তাদের একটি বিশেষ কক্ষে ডেকে নিয়ে বলতেন- ‘এখানে লাখ লাখ টাকা রয়েছে। কত লাগবে নেন।’ গ্রেপ্তারের আগে থেকেই নরসিংদীতে পাপিয়ার হোটেলকেন্দ্রিক বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে অনেক কাহিনি চালু ছিল। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আকতার বলেন, পাপিয়া প্রয়োজনে দু-একবার ফোন করেছে। জানতাম সে সমাজসেবা করে। তার ব্যবসা রয়েছে। এ ধরনের কাজে জড়িত, এটা জানা ছিল না।

নাজমা আকতার আরও বলেন, টোকন নারী পাচারকারী। নরসিংদীতে ধরা পড়ার পর সে আমার পরিচয় দিয়েছিল। পরে এলাকার নেতারা তাকে ছাড়ানোর অনুরোধ করে। পাপিয়াকে বলি, তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম সমকালকে বলেন, পাপিয়ার দুষ্টচক্রে যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এ ধরনের কারও ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। বিমানবন্দর থানার ওসি বিএম ফরমান আলী বলেন, পাপিয়াকে তার অভিযোগের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অনেক ব্যাপারে সে তথ্য দিয়েছে।

এদিকে, সদ্য বহিষ্কৃত যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউসহ গ্রেফতার চারজনকে তিন মামলায় পাঁচ দিন করে ১৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তবে এরই মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ওরফে পিউদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অনেক পিলে চমকানো তথ্য। বেরিয়ে আসছে অনেকের নাম। তদন্তে উঠে আসছে, অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে পিউর বিশেষ সম্পর্ক এবং ব্যবসার বিষয়টিও। ইতিমধ্যে র‌্যাব পিউর ঢাকার বাসা, অফিস এবং নরসিংদীর বাড়ি থেকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে। এর কিছু তথ্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে।

এই সম্পর্কিত আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close