এক্সক্লুসিভ নিউজফেসবুক থেকে

পরীশ্রমী সাবিনা ইয়াসমিনের সফলতার গল্প

মেহেদী হাসান: সাবিনা ইয়াসমিন ১৯৭৫ সালে ৪ সেপ্টেম্বর জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার সিধুলী ইউনিয়নের লোটাবর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম ফজলুর রহমান ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। মাতা মরহুমা আমিনা বেগম ছিলেন গৃহীনী।

বড় ভাই মুক্তিবাহীনিতে যোগ দেওয়ায় ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহীনী ও এদেশীয় দোশররা সাবিনা ইয়াসমিন এর পরিবারের ঘরবাড়ী আগুণে পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে বেড়ে উঠা সাবিনা ইয়াসমিন ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ। ১৯৮০ সালে মুজাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমে তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হোন। সেখান থেকে ১৯৯০ সালে কৃতিত্ত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। এসএসসি পাশ করার পর তিনি জেলা শহরে ভালো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য ইচ্ছা পোষণ করলে পরিবার থেকে বাধা আসে ।এবং বলেন যে, “তোমার বড় বোন যেহেতু স্থানীয় কলেজে পড়ে তোমাকেও এখানেই পড়তে হবে।মেয়েদের বেশী লেখাপড়ার দরকার নেই।

সাবিনা ইয়াসমিনের প্রবল ইচ্ছা,দৃঢ়তা ও স্বপ্নের কাছে হার মানে তার পরিবার।বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মরহুম আতাউর রহমান এর সম্মতিতে তিনি ভর্তি হোন জামালপুর জেলা শহরে অবস্থিত সরকারী জাহেদা শফির মহিলা কলেজে। এর মাধ্যমে শুরু হয় তার জীবনের নতুন এক অধ্যায়।

কলেজের হোষ্টেলে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যান। ১৯৯২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক শাখায় কলেজ থেকে মাত্র ২ জন শিক্ষার্থী প্রথম বিভাগে পাশ করেন তার মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিন একজন । উচ্চ শিক্ষা লাভের ইচ্ছা প্রকাশে আবারো পরিবার থেকে বাধা আসে।বিনয় ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ও বড় ভাই ফরহাদ হোসেনের সহযোগীতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯২-৯৩ সেশনে বিএসএস সম্মানে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হোন ।
সে সময় জামালপুর থেকে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই অনুন্নত। বাড়ী থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পায়ে হেটে সরিষাবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনে আসতেন। তারপর মেইল ট্রেনে রওনা হতেন চট্টগ্রামের উদ্দ্যেশে। চট্টগ্রাম পৌছতে প্রায় ২ দিন লেগে যেত। দিনের আলো যখন ফুরিয়ে যেত তখন মোমের আলোতে তিমির রাত্রি পাড় করে পৌছতেন তিনি স্বপ্নের বিদ্যাপিঠে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় পরিবার থেকে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্ত সাবিনা ইয়াসমিন পরিবারকে জানিয়ে দিলেন, লেখাপড়া শেষ করার আগে তিনি বিয়ের পিড়িতে বসবেন না। অতঃপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগে ১৯৯৭ সালে কৃতিত্ত্বের সাথে এমএসএস পাশ করেন এবং রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা থেকে ২০০৪ সালে মার্কেটিং বিভাগে এমবিএ সম্পন্ন করেন। ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকে অফিসার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে কর্ম জীবন শুরু করেন। কর্মস্থলে মেধা,মনন,সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। পরবর্তীতে প্রাইম ব্যাংকে এক্সিউকিউটিভ অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি প্রাইম ব্যাংক বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

উল্ল্যেখ্য, সারা বাংলাদেশে প্রাইম ব্যাংকের ১৪৬ টি শাখার মধ্যে তিনিই একমাত্র নারী ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পান। শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সফলতার পাশাপাশি তিনি সমাজ উন্নয়নমূলক নানা কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন।
ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি)’র সর্বোচ্চ পদ ক্যাডেট আন্ডার অফিসারের মর্যাদা লাভ করেন।
রাজনীতিতেও ছিল তার সফল বিচরণ ।বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শামছুন্নাহার হল শাখার নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ জামালপুর জেলা শাখার মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার স্নেহধন্য সাবিনা ইয়াসমিন বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামীলীগ এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য।

এছাড়াও তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতির সদস্য, ঢাকাস্থ জামালপুর জেলা সমিতির সদস্য ,বাংলাদেশ প্রতিবন্ধি ক্রীড়া সমিতির আজীবন সদস্য,বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক, রোটারি ক্লাব অব ঢাকা ফোর্ট এর সদস্য,এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জামালপুর জেলা শাখার আজীবন সদস্য।

বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও তিনি নিজ এলাকায় অসহায় মানুষকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগীতা করেন।বিশেষ করে গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিকভাবে সহযোগীতা করেন এবং অনুপ্রেরণার জন্য নিজের জীবনের গল্প শোনান। তাকে দেখে এলাকার অসংখ্য নারী অনুপ্রাণিত হয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক পুত্র সন্তানের জননী। তার স্বামী মোঃ মাজেদুল হক স্বপন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটর অথোরিটিতে ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন।

সমস্ত বাধা পেরিয়ে যখন তিনি একজন সফল নারী তখন তার স্বামীও তাকে সকল কাজে সহযোগীতা করেন। তিনি এখন তার পরিবারের গর্ব,গ্রামের গর্ব, তার এলাকার গর্ব। সর্বোপরি তিনি এখন সকলের কাছে একজন অনুকরণীয় আদর্শ।

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সফলতার জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রাণলয়ের আওতাধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্তৃক জয়ীতা অন্বেষণ ২০১৮ সালে মাদারগঞ্জ উপজেলা ও জামালপুর জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ্য জয়ীতা নির্বাচিত করা হয়।

নিজ মেধা ও মননে এবং আপনাদের সকলের দোয়া ও আশির্বাদে তিনি বাংলাদেশের একজন অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারেন।
তার গল্প ছড়িয়ে পড়ুক সকল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজে ।

এই সম্পর্কিত আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close