এক্সক্লুসিভ নিউজজাতীয়

কি ঘটেছিল সেই দিন??

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চাালানো হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার ভাষণ শেষ হওয়ার পর মুহুর্মুহু গ্রেনেড বিস্ফোরণে মারা যান মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আহত হন অন্তত ৩০০ জন। অল্পের জন্য বেঁচে যান শেখ হাসিনা।
হামলায় যারা নিহতরা হলেন- মোস্তাক আহমেদ সেন্টু, ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, রফিকুল ইসলাম আদা চাচা, সুফিয়া বেগম, হাসিনা মমতাজ রীনা, লিটন মুন্সী ওরফে লিটু, রতন সিকদার, মো. হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মামুন মৃধা, বেলাল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আতিক সরকার, নাসিরউদ্দিন সরদার, রেজিয়া বেগম, আবুল কাসেম, জাহেদ আলী, মমিন আলী, শামসুদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, ইছহাক মিয়া এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো দজন।
আহতের মধ্যে ছিলেন- প্রয়াত রাষ্ট্রপতি (দলের তত্কালীন সভাপতিমন্ডলীর সদস্য) জিল্লুর রহমান, তৎকালীন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথসহ দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।
সেই দিন কি ঘটেছিল:
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখতে শুরু করেন ৫টা ২ মিনিটে। ৫টা ২২ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করে মাইক থেকে সরে যাওয়ার মুহূর্তেই দক্ষিণ দিক থেকে কে বা কারা তাকে লক্ষ্য করে একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারে। গ্রেনেডটি ট্রাকের বাঁ পাশে পড়ে বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনা ট্রাকের ওপর বসে পড়েন। সঙ্গে থাকা অন্য নেতারা এ সময় মানববর্মের মতো চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলেন।
প্রথম গ্রেনেড হামলার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্রাক লক্ষ্য করে একই দিক থেকে পর পর আরো দুটি গ্রেনেড ছোড়া হয়। এ সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকা দেহরক্ষী পুলিশরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ অবস্থায় মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ দেহরক্ষীরা শেখ হাসিনাকে ধরে ট্রাক থেকে দ্রুত নামিয়ে তার মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে তুলে দেন। স্টেডিয়ামের দিক হয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
শেখ হাসিনা যখন ঘটনাস্থল ত্যাগ করছিলেন তখনো একই দিক থেকে কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে গ্রেনেড এসে ঘটনাস্থলে বিস্ফোরিত হতে থাকে। একই সঙ্গে চলছিল গুলির শব্দ। এসব গুলি-গ্রেনেড ঠিক কোথা থেকে ছোড়া হচ্ছিল তা বোঝা না গেলেও বেশ পরিকল্পিতভাবে যে হামলা হয়েছে তা পরে বোঝা যায়। পরে শেখ হাসিনার বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনে গিয়ে তাকে বহনকারী মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ির সামনে-পেছনে গ্রেনেড ও গুলির আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে যানবাহনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। রাস্তায় পড়ে আছে জমাট বাঁধা রক্ত, হতাহতদের শরীর থেকে বের হয়ে থাকা নাড়িভুঁড়ি, রক্তাক্ত দলীয় পতাকা-ব্যানার আর পরিত্যক্ত স্যান্ডেল। দলীয় কার্যালয়ের সামনে পেট্রলপাম্পের গলির মাথায় পড়ে আছে একটি তরতাজা গ্রেনেড। অদূরে আরেকটি। যেকোনো কারণেই হোক এগুলো বিস্ফোরিত হয়নি বা হামলাকারীরা ফেলে পালিয়েছে। আহতদের দলীয় কার্যালয়ের ভেতর থেকে বের করে ভ্যানে ওঠানো হচ্ছিল।
৬টা ১০ মিনিটের দিকে দলীয় কার্যালয়ের ভেতর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কাজী জাফরউল্লাহ ও মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয় হাসপাতালে।
উদ্ধার অভিযান চলাকালে সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে প্রচণ্ড শব্দে আরেকটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয় পুলিশের উপস্থিতিতেই সিটি ভবনের পাশের গলিতে। এর পাশেই একটি গাড়ি জ্বলছিল। পুলিশ জানায়, আগুনের উত্তাপে এখানে পড়ে থাকা গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়েছে।
ঘটনার পর উদ্ধার আর বিক্ষোভ প্রদর্শন চলছিল একই সঙ্গে। কর্মীরা আহতদের উদ্ধার করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ও ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। একই সময় চলছিল আশপাশে ভাঙচুর। রাস্তায় গ্রেনেড পড়ে থাকায় বা পাল্টা আক্রমণের ভয়ে পুলিশ সরাসরি দলীয় কার্যালয়ের সামনে না গিয়ে দূর থেকেই বিক্ষুব্ধ কর্মীদের লক্ষ্য করে ঘন ঘন টিয়ার গ্যাস ছুড়তে থাকে। এ সময় ছুটোছুটি শুরু হলে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ চালায়।
ঘটনার পরপরই র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব) ও বিডিআর সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। বিডিআর ও র‌্যাবের কর্মকর্তারা উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও ঘটনাস্থলে আসেন।
গ্রেনেড হামলার পরই মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে নগরীর ২২টি থানা এলাকাতেই টহল ব্যবস্থা আরো জোরালো করার জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরই শুরু হয় নগরীর অলিগলিতে যানবাহন তল্লাশি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং স্পর্শকাতর স্থাপনার সামনে অতিরিক্তি পুলিশ মোতায়ন করা হয়। উল্লিখিত এলাকায় বিডিআর টহলও জোরদার করা হয়।

এই সম্পর্কিত আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close